মূল সকল বিষয় পেটের মানচিত্র থেকে ব্যথার কারণ বের করার পদ্ধতি প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা

পেটের মানচিত্র থেকে ব্যথার কারণ বের করার পদ্ধতি প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা

প্রায় সবারই পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না সব সময় একই কারণে ব্যথা হয় না। আর এই কারণ বের করা সাধারণ মানুষের জন্য মোটেই সহজ বিষয় নয়। পেটে ব্যথার অনেক গুলো কারণ রয়েছে। চিকিৎসকের কাছে পেটের ব্যথা নিয়ে গেলে তারা পেটে ব্যথার অবস্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এর জন্য তাদের রয়েছে অদৃশ্য এক মানচিত্র যা নির্দেশ করে কোন ব্যথা কি কারণে হচ্ছে। অবস্থান নির্ণয় করার মাধ্যমে সে অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ তাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক হয়।

১. উপর পেটের ডান পাশে

পেটের এই অংশে পিত্তথলি এবং যকৃত অবস্থিত। তার এখানে ব্যথার সাথে এই দুই অঙ্গের সংযোগ রয়েছে।

– ভারি বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর হঠাৎই মারাত্মক পেট ব্যথা শুরু হওয়ার পর তা যদি ডান কাঁধের দিকে বিস্তার করতে শুরু করে তাহলে সম্ভবত আপনার পিত্ত থলিতে পাথর তৈরি হয়েছে।

– তীক্ষ্ণ ব্যথা বা ভোতা খিচুনি যা ডান কাঁধ বা পিঠে ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক ঘণ্টা আপনাকে কষ্ট দেয় তাহলেও তা পিত্ত থলির প্রদাহ নির্দেশ করে।

– এখানে যদি ভোতা বা তীক্ষ্ণ ব্যথা (যা আসে আর যায়) হয় তাহলে হেপাটাইটিসের কারণে হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

২. উপর পেটের মাঝ বরাবর

আপনার পেটের এই অংশে বৃহদান্ত্রের একটা বড় অংশ এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের শুরুর অংশ অবস্থিত। এখানে অগ্ন্যাশয়েরও বড় অংশ অবস্থান করে।

– খাবার খাওয়ার পর বিশেষ করে ভারি বা চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর এখানে সৃষ্ট ব্যথা যদি পিছন দিকে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে আপনার অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের কারণে ব্যথা হচ্ছে বলে ধরে নিতে পারেন।

– এখানে তীব্র ব্যথার পাশাপাশি যদি অবসাদ, বমি, ডায়েরিয়া এবং পেট ফুলে ওঠতে থাকে তাহলে ইপিগ্যাস্ট্রিক হার্নিয়া এর কারণ হতে পারে।

– বুকের সাথে সাথে এখানেও যদি জ্বালাপোড়া করে তাহলে বদহজম বা গ্যাস্ট্রাইটিসের সমস্যা নির্দেশিত হয়। এর অনেক সময় গলা ব্যথা, গ্যাসের সমস্যা, বমি এবং বদ বায়ুর প্রকোপও থাকতে পারে।

– খাবার খাওয়ার অনেকক্ষণ পর যদি বিশেষ করে মাঝরাতে এখানে তীব্র ব্যথা শুরু হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আপনি ডিওডেনাল আলসারে আক্রান্ত।

৩. উপর পেটের বাম পাশে

এখানে পাকস্থলীর বড় একটি অংশ অবস্থান করে। তাই এখানে যেকোনো রকম ব্যথার সাথে স্বাভাবিক ভাবেই পাকস্থলীর সমস্যা জড়িত।

– গ্যাস্ট্রাইটিস অথবা পাকস্থলীর প্রদাহের কারণে এখানে অস্বস্তিকর ব্যথার সাথে বমি ভাব বা বমি হতে পারে।

– জ্বালাপোড়ার মত ব্যথা হওয়ার মানে হলো আপনার পেট খালি এবং এই ব্যথার পিছনে রয়েছে আলসার।

৪. মাঝ পেটের ডানে এবং বামে

মেরুদণ্ডের দুই পাশে আপনার দুটি কিডনি অবস্থিত। এখানে ব্যথার সাথে কখনো কখনো বৃহদান্ত্রের কোনো সমস্যাও জড়িত থাকতে পারে।

– কিডনি ইনফেকশন হলে জ্বর, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, ডায়েরিয় এবং বমির পাশাপাশি এখানে ব্যথা হয়ে থাকে যা পিঠেও ছড়িয়ে পড়ে।

– ব্যথা যদি পেটের নিচের অংশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে তাহলে বুঝতে হবে আপনার কিডনিতে পাথর হয়েছে। এর সাথে বমি, জ্বর, ঘন ঘন প্রস্রাব এবং প্রস্রাবে রক্ত যাওয়ার লক্ষণও থাকতে পারে।

– এখানে ব্যথার পাশাপাশি যদি পেট ফুলে ওঠে তার মানে আপনার মল এত শক্ত এবং শুষ্ক হয়ে গেছে যে, তা শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারছে না। এটি মূলত কোষ্ঠকাঠিন্যেরই লক্ষণ।

৫. পেটের ঠিক মাঝ বরাবর

এখানে ব্যথার সাথে সরাসরি ক্ষুদ্রান্ত্র এবং বৃহদান্ত্রের সমস্যা জড়িত।

– ব্যথা এবং খিচুনির সাথে ডায়েরিয়া, দুর্বলতা, জ্বর এবং ওজন কমে যাওয়ার মানে হলো আপনি ইনফ্লামেটরি বাওয়েল ডিজিজে আক্রান্ত।

– ব্যথার সাথে বমি, পাতলা পায়খানা এবং গ্যাস বা মল বের হতে সমস্যা তৈরি হলে তা ক্ষুদ্রান্ত্রের অবসট্রাশনের প্রাথমিক লক্ষণ।

– নাভির গোঁড়ায় ব্যথার সাথে ফুলে ওঠার মানে নাভিতে হার্নিয়া হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

৬. মাঝ পেটের বাম পাশে

বাম কিডনির পাশাপাশি এখানে ডিসেন্ডিং কোলনেরও অবস্থান রয়েছে যা অস্বাস্থ্যকর খাবার, বয়সজনিত এবং অন্যান্য কারণে সংক্রমিত বা প্রদাহগ্রস্ত হয়ে ব্যথার সৃষ্টি করতে পারে।

– এখানে অবিরত ব্যথার সাথে অস্বস্তি, জ্বর ও বমি থাকলে তা ডিসেন্ডিং কোলোনের প্রদাহের কারণে সৃষ্টি হয়।

৭. নিচ পেটের ডান পাশে

পেটের এই অংশে অ্যাপেন্ডিক্স অবস্থিত যা উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধারণ করে, হজমে সহায়তা করে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অংশ নেয়।

– এখানে তীক্ষ্ণ ব্যথার সাথে অরুচি, জ্বর এবং বমি হওয়া অ্যাপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণ যার দ্রুত চিকিৎসা হওয়া জরুরি।

৮. নিচ পেটের মাঝ বরাবর

আমাদের মূত্রথলি এবং প্রজনন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অঙ্গ এখানে অবস্থিত।

– প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া এবং প্রস্রাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া মূত্রথলির ইনফেকশন নির্দেশ করে।

– মাস খানেক ধরে তলপেটে হঠাৎ হঠাৎ তীব্র ব্যথার অভিজ্ঞতা হলে তা প্রজনন সংশ্লিষ্ট কোনো অঙ্গের ব্যথা নির্দেশ করে।

৯. নিচ পেটের বাম পাশে

এখানে বৃহদান্ত্রেরে সবচেয়ে বড় অংশটি অবস্থিত, তাই যদি এই অঙ্গটি আক্রান্ত হলে নিচ পেটের বাম পাশে ব্যথা হয়ে থাকে।

– পেট ব্যথার সাথে পেটে খিচুনি, গ্যাস, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে তা ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোমের কারণে হতে পারে।

এই লেখায় উল্লেখিত ব্যথার ধরণ এবং অবস্থান শুধুমাত্র জানার জন্য দেওয়া হয়েছে। তাই পেটে ব্যথা হলে ডাক্তার দেখানোই প্রথম কাজ হবে।

আপনি কখনো পেটের ব্যথায় ভুগেছেন? কি ছিল তার কারণ? নিচের কমেন্ট বক্সে আপনার অভিজ্ঞতা জানান আমাদের।

পেটের মানচিত্র থেকে ব্যথার কারণ বের করার পদ্ধতি প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here