মূল সকল বিষয় ইন্ডিয়ান মেডিকেল ইন্ডাস্ট্রির বড় টার্গেট বাংলাদেশ

ইন্ডিয়ান মেডিকেল ইন্ডাস্ট্রির বড় টার্গেট বাংলাদেশ

CNN Health এর একটি রিপোর্ট (https://cnn.it/2Gse8zW) বলছে ইন্ডিয়া ২০২০ সালের মধ্যে তাদের মেডিকেল ইন্ডাস্ট্রিকে ৯ বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি বানাতে চায় যা বর্তমানের দ্বিগুণ। এজন্য তারা ভিসা সহজীকরণ, মেয়াদ বৃদ্ধিসহ নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। একই রিপোর্টে বিগত ৩ বছরে ইন্ডিয়ায় চিকিৎসা নিতে আসা টপ টেন দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে বাংলাদেশ প্রতিবারে শীর্ষে এবং এমনই ব্যাবধানে যেখানে অন্যান্য দেশ বাংলাদেশ এর ধারে কাছেও নেই। তার মানে কি এই যে বাংলাদেশের চিকিৎসা এইসব দেশ এমনকি আফগানিস্তান এর মত যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের তুলনাতেও অনেক অনেক খারাপ? অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং ল্যানসেট রিপোর্ট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে ভারত পাকিস্তান থেকেও এগিয়ে রেখেছে।

ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার বেসিক পার্থক্যটা বলিঃ

১) ইন্ডিয়ায় মেডিকেল পড়াশোনা ইন্টার্নশিপসহ সাড়ে ৫ বছর, এদেশে প্রায় সাড়ে ছয় বছর।

২) বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হবার জন্য ইন্ডিয়ায় পড়াশোনা ৩ বছর৷ এদেশে নূন্যতম ৫ বছর তাও রেসিডেন্সি পরীক্ষা ইন্টার্নশিপ শেষে ১ বছর পার না হলে দেয়া যায়না। আর পাশের হার ১০% এরও কম। ফলে সব মিলিয়ে ৭-৮ বছরের কম না। সরকারী ডাক্তারদের জন্য আরো বেশি কেননা তাদের নূন্যতম ২-৩ বছর বাধ্যতামূলক গ্রামে থাকতে হয় চাকুরীতে যোগদানের পরপরই, সেসময় পোস্ট গ্রাজুয়েশন এর সুযোগ নেই।

৩) অর্থাৎ ভারতীয় ডাক্তারেরা এমবিবিএসসহ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হচ্ছে সব মিলিয়ে ৮-৯ বছরে আর আমরা হচ্ছি ১২-১৫ বছরে।

৪) ভারতে ডাক্তারদের প্রাইভেট সেক্টরে এন্ট্রি স্যালারি কমপক্ষে ৩০-৬০ হাজার রূপী আর এদেশে ১৫-২২ হাজার টাকা।

৫) বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও সংশ্লিষ্ট কর্মী এবং তাদের যন্ত্রাদি সরকারি বেসরকারি সব ধরনের হাসপাতালে খুব চমৎকারভাবে আছে ভারতে আর এদেশে লক্ষ কোটি টাকার যন্ত্রাদি কেনা হয়েছে এবং ফেলে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যেখানে কোন চাহিদা দেয়া হয়নি বা দিলেও জনবল নেই চালানোর, থাকলেও রিএজেন্ট নেই বা মেশিন নস্ট ইত্যাদি। (সরকারি একটি জরীপে অংশগ্রহনের সুবাদে দেখেছি শুধুমাত্র একটি ডায়াগনোস্টিক কেন্দ্রের মাধ্যমেই বছরে ১২০০ কোটি টাকার টেস্ট এর জন্য স্যাম্পল ইন্ডিয়া পাঠানো হয়)

এবার কমার্শিয়াল দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশীদের জন্য ইন্ডিয়া কি কি করছে সেটা বলিঃ

১) কর্পোরেট হাসপাতালগুলোতে আলাদা বাংলাদেশ ডেস্ক

২) বাংলাদেশে অজস্র রেফারেল সেন্টার (মতান্তরে দলাল চক্র) যারা এদেশের সর্দি কাশির রোগীদেরও ইন্ডিয়া পাঠাতে বদ্ধ পরিকর।

৩) অবস্থাসম্পন্নদের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ যেমন আজমীর+তাজমল ঘুরে আসলে বেংগালুরুতে হেলথ চেকাপ ফ্রি।

৪) যেকোন রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড়ে যাতায়াত (সরাসরি চট্টগ্রাম থেকে বেংগালুরুতে বিশেষ ছাড়ে রোগীদের জন্য ফ্লাইট আছে যা ঢাকা-কলকাতার ভাড়ার প্রায় অর্ধেক)

৫) বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কর্পোরেট স্টাফ যারা হাসপাতালে অমায়িক ব্যবহার আর ভুবন ভুলানো হাসির বিনিময়ে লক্ষ রুপী হাতিয়ে নেবে।

৬) বিভিন্ন কর্পোরেট মেলা (হেলথ ফেয়ার, মেডিকেল ফেয়ার, মেডিকেল ইন্সট্রুমেন্ট ফেয়ার) যেখানে ইন্ডিয়ান হাসপাতাল এর স্টল প্রচুর থাকে।

৭) ইন্ডিয়ার পক্ষে কাজ করা এদেশীয় সংস্থা ওরফে দালাল যার মাঝে প্রভাবশালী গণমাধ্যম আছে যেখানে স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত ইতিবাচক কোন খবর প্রায় কখনোই না ছাপিয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এবং স্রেফ অভিযোগের ভিত্তিতে বড়বড় করে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর শিরোনাম করা হয় এবং প্রথম পাতার এক চতুর্থাংশ জুড়ে কলকাতায় চিকিৎসা নিতে গেলে শ্রীলেদার্সে জুতো কিনতে ভুলবেন না এমন বিজ্ঞাপন দেয়া হয়৷

কিছুদিন আগে জাতীয় একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে এদেশে চিকিৎসা ব্যায়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ওষুধে, প্রায় ২০ ভাগ ডায়াগনোস্টিক টেস্টে আর ৮ ভাগের মত ডাক্তারের ফি তে।

এবার সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও সমস্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি আলোচিত হয়েছে সংসদ থেকে শুরু করে পথে ঘাটে তা হলো “ডাক্তারেরা হাসপাতালে থাকেনা”, এটাই নাকি এদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি!!! আইনজীবীরা রিট করেছেন সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র‍্যাকটিস বন্ধ করার জন্য আর মাননীয় মন্ত্রীও বলেছেন ডাক্তারদের ফি বেধে দেয়া হবে। কেউ ওষুধ, টেস্ট এসব নিয়ে কিচ্ছুটি বলেনি, কারনে অকারনে কিনে ফেলে রাখা যন্ত্রপাতির বাণিজ্য ও সংশ্লিষ্ট লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতির কাহিনী বাদই দিলাম।

এদেশে নিম্নবিত্ত ব্যতিত শহর, মফস্বল নিবাসী এবং মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা তেমন নেন না, অধিকাংশই প্রাইভেট হাসপাতাল বা চেম্বার ভিত্তিক সেবা নেন। এদেশে প্রাইভেট চেম্বারের বেশিরভাগ ডাক্তার সরকারি যারা অফিস টাইমের বাইরে চেম্বার প্র‍্যাকটিস করেন। ফলে সরকারি ডাক্তার প্রাইভেট প্র‍্যাকটিস না করার আইন চলে আসলে অধিকাংশ প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ হয়ে যাবে। ডাক্তারদের ফি কমালেও চিকিৎসা ব্যায় কমবে না (ধরুন ডাক্তারের ফি ২ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা করা হলো, কিন্তু টেস্ট আর ওষুধে আপনার আগের মতই ২০ হাজার খরচ হলো, তাহলে লাভ আসলে কতটুকু?)। প্রাইভেটে কাজ করতে না পারার কারনে রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট ইত্যাদি যারা আছেন তারা সরকারি হাসপাতালে নস্ট মেশিনের সামনে বসে থাকবেন আর প্রাইভেট অনেক ডায়াগনোস্টিক সেন্টার বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে দিনশেষে এদেশের রোগীদের প্রাইভেট সেবা গ্রহনের সুযোগ অনেক বেশি কঠিন হবে অন্যদিকে ভারতে যেয়ে চিকিৎসা ও টেস্ট এর সুযোগ অনেক অনেক বেড়ে যাবে। ফলে লাভ টা কার বলুন তো?

এত ঝামেলা না করে এদেশের স্বাস্থ্য খাত সরাসরি বন্ধ করে দিয়ে ইন্ডিয়া থেকে কেনাটাই বোধহয় সবার জন্য সুবিধাজনক হবে। মানুষ তখন এদেশের ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসার স্বীকার হবেনা, এদেশের হাসপাতাল ভাংচুর করতে হবেনা, যা হবে ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে যাবে। পয়সা নাহয় একটু বেশিই লাগলো, ভালো জিনিস পেতে হলে তো পয়সা খরচ করতে হয়ই!

ইন্ডিয়ান মেডিকেল ইন্ডাস্ট্রির বড় টার্গেট বাংলাদেশ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here