মূল প্রযুক্তি ডিজিটাল ভাইরাসের ঝুঁকিতে শিশুরা

ডিজিটাল ভাইরাসের ঝুঁকিতে শিশুরা

ডিজিটাল যুগে এসে আমরা নানারকম ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছি। প্রাপ্ত বয়স্কদের পাশাপাশি এসব ডিজিটাল ভাইরাসের সবথেকে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি টেলিভিশন প্রকাশিত এক প্রামাণ্যচিত্রে শিশুদের ওপর ডিজিটাল ভাইরাসের ক্ষতিকর দিক আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।

ছোট্ট শিশুটি কত দারুণভাবে স্মার্টফোন বা ট্যাবের স্ক্রিন ব্রাউজ করছে। দেখে আমরা অনেকেই হয়তো বিস্মিত, আনন্দিত অথবা গর্ব বোধ করি।

তবে ফোনটা যখন নিয়ে নেওয়া হয়- তখন কান্না করতে দেখা যায় না শিশুদের?

একটা সমীক্ষায় দেখা যায়, শতকরা ৭০ ভাগ মার্কিন মা-বাবাই তাদের শিশুদের সামাল দেওয়ার জন্য ট্যাব বা এ ধরনের ডিভাইস ধরিয়ে দেন। ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বে প্রতি ৩ জন ইন্টারনেট ব্যবহারীর ১ জনই শিশু। আর রোজ ১ লাখ ৭৫ হাজার শিশু ইন্টারনেটে আসক্ত হচ্ছে। অর্থ্যাৎ প্রতি আধ সেকেন্ডে ১ জন শিশু নতুন করে ইন্টারনেটে যুক্ত হচ্ছে।

আবার ফেসবুক ব্যবহারকারী ২৫ শতাংশের বয়স ১০ বছরের চেয়ে কম।

ছোট ছোট শিশুদের ওপর এইসব ভার্চুয়াল আসক্তির কী ধরনের প্রভাব পড়ছে- এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে নিউইয়র্কের একদল গবেষক।

বার্নার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টডলার সেন্টার একটি পরীক্ষা চালায় শিশুদের ওপর। আইপড বনাম প্রচলিত খেলনা। কোনটা কী ধরনের প্রভাব ফেলছে তা বোঝার জন্য।

প্রথমে এই শিশুদের প্রত্যেককে একটা করে আইপড দেওয়া হলো খেলার জন্য। শিশুরা যখন আইপড দিয়ে খেলায় মগ্ন তখন প্রত্যেককে তাদের নাম ধরে ডাকা হলো।

কিন্তু দেখা যায়, ডাক তো নয়ই বরং আশেপাশে কী হচ্ছিল সে বিষয়ে শিশুদের কোন ভ্রুক্ষেপই ছিল না।

গবেষণার পরবর্তী ধাপে, শিশুদের কাছ থেকে ট্যাবগুলো সরিয়ে নেওয়া হলো।

গবেষকেরা দেখলেন, এই সময় বাচ্চারা একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলছে অনেক বেশি।

পরস্পর মিশতে শিখছে আর সৃজনশীলও হয়ে উঠছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

এই গবেষকদের একজন টোভা ক্লাইন। বার্নার্ড সেন্টার ফর টডলার ডেভেলপমেন্টের একজন পরিচালক তিনি।

ক্লাইন বলেন, শিশুকে শান্ত করার জন্য যতবেশি আপনি এসব ডিভাইস ব্যবহার করবেন তত সে নিজে নিজে কিছু শেখা থেকে পিছিয়ে পরবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি টিভিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, শিশুরা যখন চিৎকার করছে অথবা রাগারাগি করছে তাকে কোনো ডিভাইস না দিয়ে অন্যভাবে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তাকে এভাবে বলতে পারেন যে, ‘থামো! থামো! আচ্ছা বাবা এবার চুপ কর।’

এসময় এবিসি টিভির সাংবাদিকের জিজ্ঞেস করা এক প্রশ্নেও সম্মতি জানান তিনি। প্রশ্নটি ছিল, ‘অভিভাবকেরা যেহেতু ডিভাইস দিয়েই শিশুদের থামিয়ে দিচ্ছেন সেহেতু অভিভাবকেরাও মূলত শিশুদের শান্ত করার কৌশল শিখতে পারছেন না। এমনকি শিশুদের রাগ বা খারাপ লাগার অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হন না। তাই তো?’

স্মার্টফোন অথবা ট্যাবের মাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও অথবা অ্যাপের মাধ্যমে শিশুদের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছুও আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে, শিশুদেরকে সেই শিক্ষণীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। কোমলমতি শিশুদের এসব শিক্ষণীয় বিষয়ের বাইরেও আকৃষ্ট করার নানান উপকরণ সংযুক্ত করে মুনাফা কামিয়ে যাচ্ছেন প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা। আর তাই দেখা যায়, একজন অভিভাবকের চেয়ে তার শিশুর স্মার্টফোনের চেয়ে আকর্ষণ আরও বেশি।

সতর্কতা

শিশুদের এই ডিজিটাল ভাইরাসের কালো ছায়া থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের উচিত এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স শিশুদের জন্য মিডিয়া ডিভাইস ব্যবহারের কিছু নির্দেশিকা দিয়েছে। এগুলো হল-

১) ১৮ মাসের আগে কোন শিশুকে কোন ধরনের স্ক্রিনের সামনে নেওয়া যাবে না।

২) দেড় থেকে দুই বছর বয়সী শিশুরা শুধু শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখতে পারবে। এ সময় মা-বাবা’কে অবশ্যই সঙ্গে থাকতে হবে।

৩) দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীরা দিনে শুধু এক ঘন্টা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবে।

৪) আর পাঁচ বছর বয়সীদের থেকে শুরু করে কিশোর বয়সীরা দিনে পাবে মাত্র দুই ঘন্টা সময়।

এসবের সঙ্গে মেনে চলুন কিছু বিধিমালা। যেমন-

১) শিশুদের শোবার ঘরে কোন টিভি, মোবাইল বা ট্যাব কিছুই রাখা যাবে না।

২) খাবারের সময়েও এগুলো ব্যবহার করা যাবে না।

৩) রাতে ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘন্টা আগে থেকে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে শিশুদের বিরত রাখতে হবে। সোজা কথা ডিজিটাল স্ক্রিন এর ওপর এক ধরণের কারফিউ জারি করতে হবে।

সর্বোপরি, আপনার সন্তান এসব ডিজিটাল ডিভাইস কী কাজে ব্যবহার করছে বা এগুলো দিয়ে সে কী কী করছে সেদিকে খেয়াল রাখুন।

সূত্র : এবিসি টিভি।

ডিজিটাল ভাইরাসের ঝুঁকিতে শিশুরা

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here